Header Ads Widget

 


বড়াইগ্রামে কমলা চাষে ভাগ্য ফেরালেন কৃষক আব্দুল রউফ

 বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার কৃষক আব্দুল রউফের জীবন যেন এক চলচ্চিত্রের গল্প। পেয়ারা চাষে ৮ লাখ টাকার লোকসান তার পরিবারকে টালমাটাল করে দিলেও তিনি দমে যাননি বরং নতুন করে উঠে দাঁড়িয়েছেন কমলা চাষ  করে। আজ এই কমলার বাগানই তাকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করেছে, বদলে দিয়েছে তার পরিবার–পরিজনের জীবনযাত্রা।

৩ বিঘা জমিতে কমলা ও লিচুর পাশাপাশি পরিশ্রম, সততা আর অধ্যবসায় এখন বছরে তার আয় প্রায় ১০ লাখ টাকা—যা গ্রামীণ কৃষির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 

*পেয়ারা চাষে বড় ধাক্কা—৮ লাখ টাকার লোকসান*

গল্পের শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না। স্থানীয় বাজারের চাহিদা ও সম্ভাবনা দেখে কয়েক বছর আগে পেয়ারা চাষ শুরু করেছিলেন আব্দুল রউফ। কিন্তু রোগবালাই, খারাপ আবহাওয়া, বাজারদরের ওঠানামা—সব মিলিয়ে ফলন ভালো হলেও দাম পাননি তিনি।
সব হিসাব শেষ করে দেখা যায়, ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা।

এই লোকসান তার পরিবারকে কঠিন সংকটে ফেলে। অনেকেই তাকে কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশা নিতে পরামর্শ দিলেও তিনি হাল ছাড়েননি। তার ভাষায়—
“জীবনতো কঠিন হবেই, কিন্তু কৃষি ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না।”

*কৃষি কর্মকর্তাদের উৎসাহ—নতুন স্বপ্নের বীজ বপন*

লোকসানের পর তিনি যোগাযোগ করেন উপজেলা কৃষি অফিসে। জমির মাটি পরীক্ষা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং তার অতীত কৃষি অভিজ্ঞতা দেখে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ তারিক বিন আমিন  ও মোঃ জাকারিয়া তাকে পরামর্শ দেন কমলা চাষ শুরু করার।

তারা বলেন—
“বড়াইগ্রামের বেশ কিছু এলাকায় মাটির গঠন, পরিবেশ ও সূর্যালোক কমলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। যত্ন নিলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে।”

এই পরামর্শ তার জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি ধার–দেনা করে ও উপজেলা কৃষি বিভাগের সহায়তায় ১২০টি কমলার চারা রোপণ করেন। ধীরে ধীরে লিচুর গাছও যোগ হয়।

*ধৈর্য, পরিশ্রম আর নিয়মিত পরিচর্যায়  সাফল্য*

শুরুর দিনগুলো ছিল কঠিন। সার প্রয়োগ, সেচ, পোকামাকড় দমন—সব কিছুই নিয়ম মেনে করতে হয়েছে। তবে প্রতিটি গাছের প্রতি তার যত্ন ছিল সন্তানের মতো।
দুই বছরের মাথায় কমলা গাছে আসে ফুল–ফল। বাগান ধীরে ধীরে ভরে ওঠে সবুজ–হলুদ কমলায়।বর্তমান আয়–ব্যয়ের হিসাব জমির পরিমাণ: ৩ বিঘা, কমলা + লিচু চাষের বার্ষিক আয়: ১০ লাখ টাকা -মোট ব্যয়: ৪ লাখ টাকা -নিট লাভ: ৬ লাখ টাকা।
আজ তার বাগান দেখতে দূরদূরান্ত থেকে কৃষকরা আসেন। অনেকেই তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে বাড়িতে কমলা চাষ শুরু করেছেন।

*ব্যক্তিগত জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন*

পরিবারে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। একসময় যখন পেয়ারা চাষে ক্ষতির পর সংসারে নাভিশ্বাস উঠেছিল, এখন সেই পরিবারেই নতুন আলো।

আব্দুল রউফ জানান
“শুধু টাকা নয়, মানসিক শান্তিও ফিরে পেয়েছি। ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর আগের মতো দুশ্চিন্তা থাকে না।
উপজেলা কৃষিবিদ মোঃ সজীব আল মারুফ জানান, 
এ অঞ্চলে যে কমলা চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে, তা আব্দুল রউফ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে আরও অনেক কৃষক উপকৃত হবেন।

তারা আরও জানান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিকল্প ফল চাষ ও উচ্চমূল্যের ফল উৎপাদন আগামী দিনের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

*ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা*
আব্দুল রউফ এখন বাগান সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন। আরও আধুনিক সেচব্যবস্থা, জলাধার নির্মাণ এবং উন্নত জাতের চারা রোপণের উদ্যোগ নিতে চান তিনি। তার লক্ষ্য—নিজের বাগানকে সমস্ত জেলা কৃষি–সাফল্যের মডেল হিসেবে গড়ে তোলা।

*একটি জীবন্ত অনুপ্রেরণার গল্প*
পেয়ারা চাষে ভয়াবহ ক্ষতির মুখেও হাল না ছাড়া এক কৃষকের গল্প আজ হাজারো কৃষকের জন্য অনুপ্রেরণা। আব্দুল রউফ দেখিয়ে দিয়েছেন—
পরিশ্রম, ইচ্ছাশক্তি, সরকারি সহায়তা এবং কৃষিবিদদের পরামর্শ—এই চারটি মিলেই বদলে যায় ভাগ্য।

Post a Comment

0 Comments